অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিন ও পরবর্তী পদক্ষেপ

করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্বজুড়ে এখন পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে প্রায় ৬ লক্ষ মানুষের। শুধু মৃত্যু নয় মহামারী আকার ধারন করা এই ভাইরাস পাল্টে দিয়েছে বিশ্ব অর্থনীতিকেও।

বিভিন্ন দেশের শত শত বিজ্ঞানী অবিরাম গবেষণা করে যাচ্ছেন করোনার প্রতিষেধক তৈরি করতে। ইতিমধ্যে বিভিন্ন দেশ ট্রায়ালও শুরু করেছে বিভিন্ন প্রতিষেধকের। এর মধ্যে ৩টি ভ্যাকসিনের ট্রয়াল থেকে প্রাপ্ত ফলাফল আশা জাগাচ্ছে গবেষকদের।

সোমবার দ্য ল্যানসেট মেডিকেল জার্নালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাস্ট্রাজেনেকা এবং বিজ্ঞানীদের দ্বারা তৈরি করা ভ্যাকসিন AZD1222-এর প্রাথমিক পর্যায়ে ক্লিনিকাল ট্রায়ালস কোনও গুরুতর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া ছাড়াই ভ্যাকসিন প্রদানকারীদের “প্রবল প্রতিরোধ ক্ষমতা” বৃদ্ধি করেছে।

অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনটিকে বিশ্বব্যাপী গবেষণা চলা ১৫০টি ভ্যাকসিনের চেয়ে এগিয়ে আছে বলে বিবেচনা করা হয়। মার্কিন ড্রাগ প্রস্তুতকারক ফাইজার এবং চীনের ক্যানসিনো বায়োলজিকসও সোমবার তাদের প্রার্থীদের জন্য ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে যে কোনও একটি কার্যকরী টিকা অবশ্যই সবার কাছে পৌঁছে দিতে হবে।

AZD1222 ভ্যাকসিন কি: AZD1222 ভ্যাকসিনটি তৈরি করা হয় শিম্পাঞ্জিতে পাওয়া একটি সাধারণ কোল্ড ভাইরাসকে অভিযোজিত করে। এতে নতুন ধরনের করোনাভাইরাস থেকে স্পাইক গ্লাইকোপ্রোটিন নামে জিনগত উপাদান যুক্ত হয়েছিল।

এপ্রিল থেকে মে এর মধ্যে এই ভ্যাকসিনটির ট্রায়াল করা হয় যুক্তরাজ্যের ৫টি অঙ্গরাজ্যে। যাতে অংশ নেয় ১০৭৭ জন পুরুষ এবং নারী, যাদের বয়স ১৮ থেকে ৫৫ বছরের মধ্যে।

অংশগ্রহণকারীদের প্রত্যেককে একটি করে ডোজ দেওয়া হয়েছিল এবং প্রায় এক মাস তাদের শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল। এদের মধ্যে মাত্র ১০ জনকে ২৮ দিন পর দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয়েছিল।

প্রাপ্ত ফলাফলে কি দেখা যায়: অক্সফোর্ডের শীর্ষ গবেষক সারা গিলবার্ট বলেন, পরীক্ষার ফলাফল আশানুরূপ হলেও, এই ট্রয়ালটি থেকে মানবদেহের জন্য নিরাপদ ডোজের সংখ্যা নির্ধারণ করা যায়নি।

প্রাথমিক ফলাফলের পর কোন কোন বিজ্ঞানী সতর্ক করেন এবং কেউ কেউ ভবিষ্যদ্বাণী করেন যে, ভ্যাকসিনটি আসলে কাজ করে কিনা তা জানতে আগামী বছরের মাঝামাঝি পর্যন্ত সময় লাগবে।

প্রতিক্রিয়া: অক্সফোর্ড স্টাডির প্রধান গবেষক অ্যান্ড্রু পোলার্ড বলেন, এন্টি-করোনাভাইরাস বিরোধী প্রচেষ্টায় তারা একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলকে ছিল। তবে গবেষকরা আরো বলেন, এখন ভ্যাকসিনটি বড় আকারের ট্রায়াল পরিচালনা করে জনগণকে সুরক্ষা দেয় কিনা তা মূল্যায়নের চেষ্টা করার জন্য দ্রুত এগিয়ে চলেছে”।

অ্যাস্ট্রাজেনিকার প্রধান গবেষক মেনা পাঙ্গালোস এক বিবৃতিতে বলেন, সোমবারের ডাটা “আমাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে যে ভ্যাকসিনটি কাজ করবে এবং আমাদেরকে বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত ও ন্যায়সঙ্গতভাবে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য বড় আকারে উৎপাদন করার জন্য আমাদের পরিকল্পনা চালিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়”।

হুয়ের জরুরী অবস্থার প্রধান মাইক রায়ান প্রশংসা করে বলেন, ভ্যাকসিন পরীক্ষা থেকে প্রাপ্ত ফলাফল আমাদের জন্য সুখবর বয়ে এনেছে। তবে এখনও আমাদের অনেক পথ যেতে হবে।

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন, যার সরকার এই প্রকল্পের জন্য তহবিল সহায়তা করেছে, এই ঘোষণাটিকে “অত্যন্ত ইতিবাচক সংবাদ” হিসাবে প্রশংসা করেন।

পরবর্তী পদক্ষেপ: ব্যাপক উৎপাদন ও বিশ্বব্যাপী বিতরণের জন্য একটি ভ্যাকসিন অনুমোদিত হওয়ার আগে, তিনটি পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়, কখনও কখনও চারটি ধাপের মধ্য দিয়েও যেতে হয়। ভ্যাকসিন বিকাশের প্রথম ধাপে এর প্রতিরোধ ক্ষমতা পরীক্ষা করা হয়।

ভ্যাকসিনটির তৃতীয় ধাপের পরীক্ষা যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং ব্রাজিলে ইতিমধ্যে চলছে এবং করোনা ভাইরাসের সংস্পর্শে আসলে টিকা দেওয়া লোকেরা কতটা সুরক্ষা পেয়েছে তা লক্ষ্য করা হচ্ছে।

“অক্সফোর্ড গবেষক গিলবার্ট বলেন,” এখনও আরও অনেক দীর্ঘ পথ যেতে হবে। ” তিনি আরো বলেন, আমাদের আরও পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন যে, এই গবেষণায় প্রয়োগ করা বয়স্ক ব্যক্তিদের, যারা গুরুতর রোগের বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন, মধ্যে ভ্যাকসিনগুলি কীভাবে প্রতিক্রিয়া করে

“সুতরাং এটি নিয়ে ভবিষ্যতে আরো কাজ করার সুযোগ আছে, এবং আরও প্রকাশনা আসবে।”

বিশ্বজুড়ে কোভিড-19-এর জন্য ১৫০ টিরও বেশি ভ্যাকসিন তৈরি করা হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী ভ্যাকসিন তৈরির দৌড়ের গতি নজিরবিহীন হলেও, বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে একজন সফল গবেষকের পর্যাপ্ত পরিমাণে উৎপাদন প্রথম পর্যায়ে গবেষকের ভ্যাকসিনটি পরীক্ষা করার মতোই কঠিন হতে পারে।