আখেরি মোনাজাতে শেষ ইজতেমার প্রথম পর্ব

10

আখেরি মোনাজাতে সৃষ্টিকর্তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা, দেশ ও মানবতার কল্যাণ কামনায় টঙ্গীর তুরাগতীরে শেষ হল এবারের বিশ্ব ইজতেমায় প্রথম পর্ব। রোববার বেলা ১০টা ৪০ এ আখেরি মোনাজাত শুরু হয়; ৩৫ মিনিটের এ মোনাজাত পরিচালনা করেন কাকরাইল মসজিদের ইমাম তাবলিগের শুরা সদস্য মাওলানা জুবায়ের।

মুনাজাতের আগে সকাল সাড়ে ৯টা থেকে ইজতেমা ময়দানে হেদায়তি বয়ান করেন তিনি। আর ইঞ্জিনিয়ার মাওলানা মো. আনিছ ভোরে দেন তাবলিগের ছয় উশুলের বয়ান।

এবারই প্রথম আরবির সঙ্গে বাংলায় বিশ্ব ইজতেমার আখেরি মোনাজাত করা হল। আগে ভারতের মাওলানা সাদ কান্ধলভি কিংবা জোবায়রুল হাসানের আরবি ও উর্দু বয়ান বাংলায় তরজমা করে শোনাতেন মাওলানা জুবায়ের।

তাবলীগের আমির ভারতের মাওলানা জোবায়রুল হাসানের মৃত্যুর পর গত দুই বছর দিল্লির মাওলানা সাদ কান্ধলভী আরবি কিংবা উর্দুতে মোনাজাত পরিচালনা করতেন।

নানা বিতর্ক আর তাবলিগ জামাতের একাংশের বিক্ষোভের পর মাওলানা সাদকে এবার ইজতেমায় অংশ না নিয়েই ভারতে ফিরে যেতে হয়েছে।

সাদের অনুপস্থিতিতে আখেরি মোনাজাত পরিচালনার ভার পড়ে বাংলাদেশের মাওলানা জুবায়েরের ওপর। তিনি এবারই প্রথম আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করলেন। তার মোনাজাতের প্রথম ১৪ মিনিট ছিল আরবিতে। পরের ২১ মিনিট বাংলায়।
এ মোনাজাতে মুসলিম জাহানের কল্যাণ কামনা করা হয়। মোনাজাত প্রচারের জন্য গণযোগাযোগ অধিদপ্তর ও গাজীপুর জেলা তথ্য অফিস বিশেষ ব্যবস্থা নেয়।

গাজীপুর সিটি করপোরেশনের পোড়াবাড়ি এলাকার বাসিন্দা আবুল কালাম আজাদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “৩০ বছর ধরে বিশ্ব ইজতেমার মোনাজাতে অংশ নিচ্ছি। আমি উর্দু-আরবি বুঝি না। আগে ওইসব ভাষায় মোনাজাতে কী বলত বুঝতে পারতাম না। সবার সঙ্গে শুধু ‘আমিন’ বলতাম। এবার বাংলায় হওয়ায় বুঝতে আর সমস্যা হয়নি।”

গত শুক্রবার ভোরে আম বয়ানের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল ৫৩তম বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব। এই পর্বে অংশ নেন ঢাকাসহ ১৭ জেলার মুসলমানরা। বাংলাদেশ ছাড়াও ৯৮টি দেশের ১৯ হাজার ৮০০জন মুসলমান এই পর্বের ইজতেমায় অংশ নেন বলে গাজীপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. মাহমুদ হাসান জানান।

চার দিন বিরতি দিয়ে ঢাকা ছাড়াও আরও ১৫ জেলার মুসলমানদের অংশগ্রহণে আগামী শুক্রবার শুরু হবে বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্ব। ২১ জানুয়ারি আখেরি মোনাজাতের মধ্যামে শেষ হবে বিশ্ব তাবলিগ জামাতের এই বার্ষিক সম্মিলন।

এর বাইরে দেশের বাকি ৩২টি জেলার মানুষ আগামী বছর দুই পর্বে ইজতেমায় অংশ নেবেন।

আখেরি মোনাজাতকে কেন্দ্র করে শনিবার মধ্যরাত থেকেই ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের গাজীপুরের ভোগড়া বাইপাস থেকে ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত সড়কে যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। গাজীপুরসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলার মানুষ ভোরে কনকনে শীত আর কুয়াশার মধ্যেই পায়ে হেঁটেই টঙ্গীর পথে রওনা হয়।
গাজীপুরের ভোগড়া এলাকার বাসিন্দা আয়নাল হক বলেন, ভোরে প্রায় ১০ কিলোমিটার পথ রিকশায় ও পায়ে হেঁটে তিনি ময়দানে এসেছিলেন মোনাজাতে অংশ নিতে। আবার হেঁটেই বাড়ি যাচ্ছেন। কষ্ট হলেও এ নিয়ে তার কোনো অভিযোগ নেই।

মোনাজাতের আগে ইজতেমা ময়দানে চটের সামিয়ানার নিচে বয়ান শোনেন হাজারো মানুষ। ময়দান ভরে যাওয়ায় কুয়াশা আর ঠাণ্ডার মধ্যেই অলিগলি ও রাস্তায় পাটি, খবরের কাগজ, পলিথিন বিছিয়ে তাতেই অবস্থান নেন অনেকে।

ইজতেমা ময়দান ছাড়াও দক্ষিণে খিলক্ষেত, উত্তরে চেরাগ আলী, পূর্বে টঙ্গী বিসিক শিল্পনগরী ও পশ্চিমে আশুলিয়া পর্যন্ত প্রায় ১০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় প্রায় ২৫ লাখ মানুষ শামিল হন এই মোনাজাতে।

ঢাকা ও আশপাশের এলাকা থেকে বহু নারীও মোনাজাতে অংশ নিতে এসেছিলেন। ময়দানে ঢোকার অনুমতি না থাকায় তারা আশপাশের বিভন্ন কারখানা ও আবাসিক ভবনের ছাদে অবস্থান নিয়ে মোনাজাতে হাত তোলেন।

নরসিংদী থেকে টঙ্গীতে আসা কামরুন্নাহার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, নারীদের মোনাজাতে অংশ নেওয়ার জন্য ময়দানের বাইরে আলাদা ব্যবস্থা করা উচিৎ।

আখেরি মোনাজাতের জন্য এদিন ইজতেমা ময়দানের আশে-পাশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কলকারখানাসহ বিভিন্ন অফিসে ছিল ছুটি।
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আকম মোজাম্মেল হক, গাজীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য জাহিদ আহসান রাসেল, গাজীপুরের জেলা প্রশাসক দেওয়ান মুহাম্মদ হুমায়ুন কবীর, গাজীপুরের পুলিশ সুপার মুহাম্মদ হারুন অর রশিদ, মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট আজমত উল্লাহ খান, গাজীপুর মহানগর যুবলীগ আহ্বায়ক কামরুল আহসান সরকার রাসেল উপস্থিত ছিলেন আখেরি মোনাজাতে।

মোনাজাত শেষে টঙ্গী থেকে সবার বাড়ি ফেরার সুবিধার্থে ১৯টি বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করেছে রেল কর্তৃপক্ষ। তারপরও সবার একসঙ্গে বাড়ি ফেরার তাড়াহুড়ায় টঙ্গীর কামারপাড়া সড়ক, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক, টঙ্গী- কালীগঞ্জ সড়কের আহসান উল্লাহ মাস্টার উড়াল সেতু ও আশপাশের সড়ক-মহাসড়ক এবং সংযোগ সড়কগুলোতে সৃষ্টি হয় যানজট।

গাজীপুরের পুলিশ সুপার হারুন আর রশিদ জানান, আখেরি মোনাজাতের পর মানুষের বাড়ি ফেরা পর্যন্ত ইজতেমা ময়দানসহ আশপাশের এলাকায় সাত হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য নিয়োজিত থাকবেন।