শিশুশ্রম ও বাস্তবতা

177

ততক্ষণে ডুবে গেছে রাতের শুকতারা। মায়াবী আলোয় ঘুম ভাঙে জহুরুলের। দরজার ঝাপ টেনে উঠোনে নামে সে। বাসি থালা বাসন ধোয়া-পাকলা শুরু করেছেন মা জহুরা বেগম। আলো ফোটা ভোরে বাবা ইউনুস আলী রিকশা চালাতে বের হয়েছেন। মাথায় পাহাড়সম ভাবনা জহুরুলের। বেলা বেড়ে গেলে কাজ পাবে না, আর কাজ না পেলে উপোষ থাকতে হবে। এ চিন্তা তাকে তাড়িয়ে বেড়ায় সারাক্ষণ। তাই ক্ষুধার তীব্র জালা নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয় জহুরুল। খোঁজে জীবন জীবিকার পথ । অবশেষে কাজ পায় চা ষ্টল, হোটেল, রেস্টুরেন্টে, রাজমিস্ত্রীর জোগাইলা, বেকারী কিংবা ওয়েলডিং কারখানায়। এভাবেই প্রতিদিনের জীবন যুদ্ধ শিশু জহুরুলের।

সিরাজগঞ্জের কাজিপুর উপজেলার পাইকপাড়া গ্রামে জহুরুল ইসলামের বাড়ি। পাঁচ সদস্যের ভুমিহীন পরিবার। পরাশ্রয়ী বসবাস। তিন ভাইয়ের মধ্যে জহুরুল বড়। স্কুলে পড়ার সৌভাগ্য হয়নি। অভাবের সংসারে জহুরুলকে অল্প বয়সেই হাল ধরতে হয়েছে পরিবারের।

বগুড়ার ধুনট শহরের এক চা স্টলে কাজ করে জহুরুল। বয়স দশ বছর। মাই টিভ‘র ক্যামেরা ইউনিট এরশাদের ডাকা ”চল চল তিস্তা চল” লং মার্চে। ধনুটে চা পানের বিরতি। চার স্টলে কথা হচ্ছিল জহুরুলের সঙ্গে বলছে ….৬ মাস ধইরা এহানে কাম হরি। দিনে ১৫ টেহা পাই। ওই কয়ডা টাহা দিয়্যা কিছুই অয় না।

তার উপর ভুল অইলেই মালিকের হাতে মাইর খাওয়া নাগে। সহাল থ্যান ম্যালা রাইত পন্তক কাম হরি। এত রাইত পন্তক কাম হইরা সহালে আর উঠপের পারি না। তাও কামে আসা লাগে। নাঅলি খাব কি? একই কথা শোনা গেল হোটেল বয় জামিল, পাশের ওয়েলডিং কারখানার মজিদ ও বেকারির নয়নের মুখে। ওরা সবাই শিশু শ্রমিক। বয়স ৮ থেকে ১০ এর কোঠায়। সুস্থ্য-অসুস্থ্য যাই থাকুক না কেন কাজে তাদের আসতেই হয়।

কাজ বন্ধ মানেই যে ওদের উপোষ থাকা। বেচে থাকার তাগিদে শিশুরা বিভিন্ন কাজে নিয়েজিত হতে বাধ্য হচ্ছে। যে বয়সে শিশুর স্কুলে যাওয়ার কথা, এককা-দোক্কা, গোল্লাছুটসহ বিভিন্ন খেলা করে হাসি আনন্দে বেড়ে ওঠার কথা। আর তখন সেই শিশুকে ধরতে হচ্ছে সংসারের হাল।

দারিদ্রতায় বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে হচ্ছে। জলন্ত কয়লা, বয়লারের গনগনে আগুনের শিখা, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি নিয়ে কাজ করতে হয় তাদের। অভাবের তারণায় হারিয়ে যাচ্ছে শিশুদের সোনালী শৈশব। প্রতি বছর ১২ই জুন ঘটাকরে পালিত হয় শিশু শ্রম প্রতিরোধ দিবস। ‘আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যত’ -এ স্লোগান এখন শুধু বই পুস্তক আর বক্তব্যের শোভা পায়। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন।

হাসান জাকির