রহমত মাগফিরাত নাজাতের সওগাত

2

শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী : 

দীর্ঘ দুটি মাসের নিরন্তর দোয়া ও প্রার্থনা ছিল: ‘হে আল্লাহ, রজব ও শাবান মাস আমাদের জন্য বরকতময় করুন এবং রমাদান আমাদের নসিব করুন!’ এই দোয়া কবুল হলো। আজ তা বাস্তবে পরিণত হলো। তাই আনন্দচিত্তে সুস্বাগত জানাচ্ছি মহিমান্বিত মাহে রমাদানকে—‘আহলান সাহলান মাহে রমাদান’ বা ‘সুস্বাগত মাহে রমাদান’।

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন: যখন রমাদান মাস আসে, তখন বেহেশতের দরজা খুলে দেওয়া হয়, দোজখের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়; শয়তানকে শৃঙ্খলিত করা হয়। (বুখারি, সওম অধ্যায়, পরিচ্ছেদ: ১,১৮৭, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ২৪১, হাদিস: ১,৭৭৮)।

হিজরি চান্দ্রবর্ষের নবম মাসের আরবি নাম রমাদান। ফারসি, উর্দু, হিন্দি ও বাংলা উচ্চারণে এটি হয় ‘রমাজান’ বা ‘রমজান’। রমাদান বা রমজান শব্দের অর্থ হলো প্রচণ্ড গরম, সূর্যের খরতাপে পাথর উত্তপ্ত হওয়া, সূর্যতাপে উত্তপ্ত বালু বা মরুভূমি, মাটির তাপে পায়ে ফোস্কা বা ঠোসা পড়ে যাওয়া; পুড়ে যাওয়া, ঝলসে যাওয়া; সেদ্ধ হওয়া, কাবাব বানানো; ঘাম ঝরানো; চর্বি গলানো; জ্বর, তাপ ইত্যাদি।

রমাদানে ক্ষুধা-তৃষ্ণায় রোজাদারের পেটে আগুন জ্বলে; তাই এই মাসের নাম রমাদান। রমাদান মাসে পাপ তাপ পুড়ে ছাই হয়ে রোজাদার নিষ্পাপ হয়ে যায়; তাই এই মাসের নাম রমাদান। হাদিস শরিফে এই মাসকে ‘রমাদান আল মুবারক’ (যার অর্থ বরকতময় রমাদান বা প্রাচুর্যময় রমাদান) এবং ‘রমাদান আল কারিম’ (যার অর্থ সম্মানিত ও মহিমান্বিত রমাদান) নামে অভিহিত করা হয়েছে। (লিসানুল আরব, ইবনে মানজুর রহ.)।
‘সওম’ আরবি শব্দ। এর অর্থ বিরত থাকা। এর বহুবচন হলো ‘সিয়াম’; ফারসি, উর্দু, হিন্দি ও বাংলায় সওমকে বলা হয় ‘রোজা’। কোরআন কারিমে এসেছে: ‘যারা ইমান এনেছ! তোমাদের প্রতি “সিয়াম”-এর ফরজ বিধান নির্ধারণ করা হয়েছে, যেমন ফরজ নির্ধারণ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের জন্য; যেন তোমরা তাকওয়া বা পবিত্রতা ও সাবধানতা অবলম্বন করতে পারো।’ (সুরা-২, বাকারা, আয়াত: ১৮৩)।

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, মহানবী হজরত মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: ‘যে ব্যক্তি ইমানের সহিত সওয়াবের নিয়তে রমাদান মাসে সওম পালন করবে, তার অতীতের সব গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।’ (বুখারি শরিফ, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৩১, ইমান অধ্যায়, পরিচ্ছেদ: ২৮, হাদিস: ৩৭)।

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, নবীজি (সা.) বলেন: যে ব্যক্তি মিথ্যা বলা ও মিথ্যা আমল বর্জন করেনি, তার এ পানাহার পরিত্যাগ করায় আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই। (বুখারি, সওম অধ্যায়, পরিচ্ছেদ: ১১৯১, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ২৪২-২৪৩, হাদিস: ১৭৮২)।

সমস্যাগ্রস্ত ব্যক্তিদের জন্য রমাদানে রয়েছে বিশেষ ছাড়। দয়াময় আল্লাহ তাআলা বলেন: ‘সিয়াম বা রোজা নির্দিষ্ট কয়েক দিন (এক মাস) মাত্র। তবে তোমাদের যারা পীড়িত থাকবে অথবা ভ্রমণে থাকবে, তবে অন্য সময়ে তা এর সমপরিমাণ সংখ্যায় পূর্ণ করবে। আর যাদের রোজা পালনের সামর্থ্য নেই, তারা এর পরিবর্তে ফিদইয়া দেবে একজন (প্রতিদিনের জন্য) মিসকিনের খাবার। অনন্তর যে ব্যক্তি অধিক দান করবে, তবে তা তার জন্য অতি উত্তম। আর যদি তোমরা পুনরায় রোজা পালন করো, তবে তা তোমাদের জন্য অধিক উত্তম।’ (সুরা-২ বাকারা, আয়াত: ১৮৪)।

প্রত্যেক সক্ষম মুমিন নারী-পুরুষের জন্য রমাদানে পূর্ণ মাস রোজা পালন করা ফরজ ইবাদত। রমাদানের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছে দুটি ওয়াজিব। যথা: সামর্থ্যবানগণ সদকাতুল ফিতর আদায় করা ও ঈদের সালাত কায়েম করা। এ ছাড়া রমাদান মাসে রয়েছে বিশেষ পাঁচটি সুন্নাত। যথা:

১. সাহ্‌রি খাওয়া। হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) বর্ণনা করেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: তোমরা সাহ্‌রি খাও, কেননা সাহ্‌রিতে রয়েছে বরকত। (বুখারি, সওম অধ্যায়, পরিচ্ছেদ: ১২০৩, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ২৫০, হাদিস: ১৮০১)। হজরত আমর ইবনে আস (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: আহলে কিতাবদের রোজা এবং আমাদের রোজার মধ্যে পার্থক্য হলো সাহ্‌রি খাওয়া (ও না খাওয়া)। (মুসলিম, আলফিয়্যাতুল হাদিস: ৫৫৮, পৃষ্ঠা: ১৩১)।

২. ইফতার করা। হজরত সাহল ইবনে সাআদ (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: যত দিন যাবৎ লোকেরা ওয়াক্ত হওয়ামাত্র ইফতার করবে, তত দিন তারা কল্যাণের ওপর থাকবে। (বুখারি, সওম অধ্যায়, পরিচ্ছেদ: ১২২৭, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ২৬৮, হাদিস: ১৮৩৩)। ৩. তারাবিহর নামাজ আদায় করা। ৪. পবিত্র কোরআন মাজিদ তিলাওয়াত করা। ৫. ইতিকাফ করা।

হজরত সাহল (রা.) বর্ণনা করেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: জান্নাতে রায়্যান নামক একটি দরজা আছে। এ দরজা দিয়ে কিয়ামতের দিন রোজাদাররাই প্রবেশ করবে। তাদের প্রবেশের পরই দরজা বন্ধ করে দেওয়া হবে। তাদের ছাড়া আর কেউ এই দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না। (বুখারি, সওম অধ্যায়, পরিচ্ছেদ: ১,১৮৬, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ২৩৯-২৪০, হাদিস: ১,৭৭৫)।

রমাদান কোরআন নাজিলের মাস। সব আসমানি কিতাব এই মাসেই নাজিল হয়েছিল। কোরআন তিলাওয়াতে প্রতিটি হরফ বা বর্ণে কমপক্ষে ১০টি করে সওয়াব বা নেকি লাভ হয়। রমাদান মাসে প্রতিটি নেক আমলের ফজিলত সত্তর গুণ বৃদ্ধি করে দেওয়া হয়। রমাদান মাসে একেকটি নফল ইবাদতের সওয়াব বা বিনিময় ফরজ ইবাদতের সমান পুণ্যরূপে দান করা হয়। রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের সওগাতের ডালি নিয়ে এল মাহে রমাদান। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: রমাদানের প্রথম অংশ রহমত বা দয়া করুণা, মাঝের অংশ মাগফিরাত বা ক্ষমা, শেষাংশ নাজাত বা মুক্তি। (বায়হাকি)। রহমতের বারিতে সিক্ত হয়ে, ক্ষমার মহিমায় উজ্জীবিত নবজীবন লাভ করে, নাজাত বা অনন্ত মুক্তির নতুন দিগন্তের জান্নাতি আহ্বানে অফুরান কল্যাণের পথে অভিযাত্রার শুভলগ্ন মাহে রমাদান।

মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতির যুগ্ম মহাসচিব ও আহ্ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম–এর সহকারী অধ্যাপক